নলছিটি (ঝালকাঠি) প্রতিনিধি:
রক্তের কোনো টান নেই, নেই কোনো জন্মসূত্র; তবুও দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি ছিলেন একটি পরিবারের ছায়াসঙ্গী। ঝালকাঠির নলছিটির বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার মাহফুজ খানের পরিবারের সেই অতি পরিচিত মুখ ‘আজুফা’ গত বুধবার রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দীর্ঘদিনের এই সঙ্গিনীর মৃত্যুতে ওই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
আজুফার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনায় শুক্রবার (জুম্মাবাদ) এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেন গৃহকর্তা মাহফুজ খান। মল্লিকপুরে নিজ বাড়িতে প্রায় ৫০০ জন মানুষকে দাওয়াত করে খাবারের আয়োজন করেন তিনি। দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে স্মরণ করা হয় পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠা এই আজুফাকে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৪০ বছর আগে এক অসহায় অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজে মাহফুজ খানের পুরাতন বাড়িতে আসেন আজুফা। তখন তিনি নিজের পরিচয় বা আত্মীয়-স্বজনের কোনো হদিস দিতে পারেননি। আজুফার সেই অসহায়ত্ব দেখে মাহফুজ খানের মা তাকে নিজের কাছে রেখে দেন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে তিনি বাড়ির পরিচারিকা থেকে হয়ে ওঠেন পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য সদস্য।
স্বভাবজাতভাবেই আজুফা ছিলেন স্বল্পভাষী ও পরিচ্ছন্ন। বাড়ির ছোট-বড় সবার প্রতি তার ছিল গভীর মমতা। তার আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে মাহফুজ খানের মা মৃত্যুর আগে ছেলেকে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন, “আজুফাকে সারাজীবন নিজের কাছে আগলে রাখিস।” মায়ের সেই কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন মাহফুজ খান। দীর্ঘ সময় তাকে মায়ের মতো পরম যত্ন ও স্নেহে আগলে রেখেছিলেন তিনি।
গৃহকর্তা মাহফুজ খান জানান, “আজুফা আমাদের কাছে শুধু গৃহকর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আমাদের পরিবারের অভিভাবকের মতো। আমার মা তাকে নিজের মেয়ের মতো দেখতেন। আজ তিনি নেই, তার আত্মার শান্তির জন্য আমাদের এই সামান্য আয়োজন।”
স্থানীয়রা জানান, বর্তমান সময়ে যেখানে আপনজনেরাই একে অপরের দায়িত্ব নিতে চায় না, সেখানে একজন পরিচয়হীন মানুষকে ৪০ বছর ধরে আশ্রয় দেওয়া এবং তার মৃত্যুর পর এমন রাজকীয় বিদায় জানানো মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। নলছিটির মানুষের হৃদয়ে আজুফা ও এই পরিবারের ভালোবাসার গল্প দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।