শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর, ২০২১ ইং, দুপুর ১২:৫২

দেশে করোনার তৃতীয় ঢেউ আসতে পারে যেসব কারণে

অনলাইন ডেস্ক::

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু কমলেও আরেকটি ঢেউ আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন অবস্থায় নতুন করে আতঙ্কের কারণ হয়েছে তৃতীয় ঢেউ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব থেকে করোনাভাইরাস পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে।

গত বছরের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সংক্রমণের হার নেমে আসে। তবে মার্চ মাস থেকে আবারও বাড়তে থাকে আক্রান্ত-মৃত্যুর হার। জুন- জুলাই মাসে তা ভয়াবহ রূপ নেয়। সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। শনাক্তের হারও বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ শতাংশের ওপরে।

তবে, আগস্ট মাস থেকে আবার কমতে শুরু শনাক্ত। কমে আসে মৃত্যুর মিছিলও। যদিও বাংলাদেশে তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানার কারণ হিসেবে সম্ভাব্য কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে টিকা দেওয়াকে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি বলে মনে করা হয়। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণার বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ টিকা দেওয়ার হারে অনেক পিছিয়ে আছে। আর সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ফলে আরেকটি ঢেউ আঘাত হানার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানদের নিয়ে গঠিত কোভিড-১৯ টাস্কফোর্সের এক ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে, দেশে মোট জনসংখ্যার ২ দশমিক ৬১ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে জনসংখ্যার অনুপাতে এক ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ মানুষকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন প্রায় দুই কোটি ১৯ লাখ মানুষ। এর মধ্যে সম্পূর্ণ দুই ডোজ টিকা পেয়েছেন এক কোটি ৪৪ লাখ মানুষ।
কিন্তু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এই হার একেবারেই কার্যকর নয় বলেই জানাচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোস্তাক আহমেদের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা তাদের প্রতিবেদনে জানায়, টিকা দিলে ভাইরাস দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ তাদের অধিকাংশ মানুষকে টিকার আওতায় পারায় মৃত্যু ঠেকাতে পারছে।
কিন্তু বাংলাদেশে এখনও জনসংখ্যার তুলনায় টিকার মজুত ও সরবরাহ সন্তোষজনক নয় বলে তিনি জানিয়েছেন।

এদিকে গত মাস থেকে সংক্রমণ হার কমতে শুরু করায় লকডাউন তুলে দেওয়ার পাশাপাশি সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাজের ওপর নিষেধাজ্ঞায় কিছু শিথিলতা আনা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মানার যে উদাসীনতা, তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ করোনাভাইরাসের আরেকটি ঢেউয়ের মুখোমুখি হতে পারে বলেও আশঙ্কা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের।

অন্যদিকে ভারত থেকে সংক্রমণের প্রভাবকেও অনেকাংশে দায়ী করা হয়ে থাকে। বলা হয়, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের তিনটি দিকে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত থাকায় এবং তাদের সঙ্গে সব নিয়মিত যোগাযোগ হওয়ায় ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে বাংলাদেশের সংক্রমণও অনেকটাই প্রভাবিত।
সম্প্রতি ডেল্টা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ, ভারত থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়।
আর সামনে দুর্গাপূজা থাকায় ভারতে মানুষের চলাচল অস্বাভাবিক হারে বাড়বে। একই সঙ্গে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশর মানুষের অবাধ চলাচলও বেড়ে যাবে। ফলে দেশটিতে পুনরায় করোনাভাইরাস লাগামহীনভাবে বাড়তে পারে, যার ফলে বাংলাদেশে তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে।
এ ব্যাপারে বেনজির আহমেদ বলেন, ‘ভারতের সাথে আমাদের ফরমাল-ইনফরমাল যাতায়াত রয়েছে। তাই ওই দেশে যদি করোনাভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানে। সেটা আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তাই ভারতের সংক্রমণ পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে হবে।’
ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কমিটির রিপোর্টেও, এই তৃতীয় ঢেউ শুরুর বিষয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই ঢেউ আগামী অক্টোবরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠবে।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে শুরু থেকেই লকডাউন ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে দেখা গেছে। একবার কঠোর লকডাউন, তো কয়েক দিন পর থেকেই তা সীমিত আকারে শিথিল করা হয়েছে। এর আবার এসেছে কঠোর লকডাউনের ঘোষণা, কিন্তু তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। গণপরিবহন বন্ধ রেখে সব অফিস খুলে উল্টো জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলেছে।
ঢাকার বিমানবন্দরে আরটি পিসিআর ল্যাব বসানো নিয়ে জটিলতা সিদ্ধান্তহীনতার একটি উদাহরণ হতে পারে। এ ছাড়া টিকার ভুয়া রিপোর্ট, মাস্ক কেলেঙ্কারি, চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয় ও সংগ্রহে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও করোনাভাইরাসের মোকাবিলার বিষয়টিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এ ধরণের দুর্নীতি ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে দীর্ঘসূত্রিতা ও অদক্ষতা বাংলাদেশকে করোনাভাইরাসের পরবর্তী ঢেউয়ের দিকে ধাবিত করতে পারে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি রয়েছে হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ মোকাবিলায় ব্যর্থতা।
গত বছরের তুলনায় এবারে শয্যা সংখ্যা, আইসিইউ, ভেন্টিলেটর বা অক্সিজেন সরবরাহ, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলাসহ অন্যান্য চিকিৎসা সুবিধা বাড়লেও বড় ধরনের ঢেউ সামাল দিতে তা এখনও যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এ ছাড়া জনসংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালগুলোর ডাক্তার, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। স্বাস্থ্য খাতে খালি পদগুলো পূরণে দীর্ঘসূত্রিতা দূর করার ওপর তারা জোর দেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোভিড পরিস্থিতি ভালো থাকা অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার এই ত্রুটিগুলো দূর করে বাংলাদেশের উচিত হবে সম্ভাব্য তৃতীয় ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুত হওয়া।