রবিবার, ২৮শে নভেম্বর, ২০২১ ইং, সকাল ৮:৩৭

সবচেয়ে কম মজুরি শ্রমিক পাওয়া যায় সিলেটে

অনলাইন ডেক্স::

মহামারি করোনা’র ধাক্কা সামলে অর্থনী’তির ঘুরে দাঁড়া’নোর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দিনম’জুর ও শ্রমিক’দের মজুরিতে। গত তিন মাস ধরেই বাড়ছে অর্থনীতি’র গুরুত্বপূর্ণ সূচক মজুরি।

তবে অবিশ্বাস্য তথ্য হ’চ্ছে, রংপুরে মজু’রি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি, সিলেটে সব’চেয়ে কম।

সরকারি হিসাবে গত সেপ্টেম্ব’র মাসে বাংলাদে’শের বিভিন্ন খা’তের শ্রমি’কদের গড়ে মজুরি বেড়েছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গত বছরের সেপ্টে’ম্বরে শ্রমিক ও দিনমজু’ররা গড়ে ১০০ টা’কা মজুরি পে’লে এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পেয়েছেন ১০৫ টাকা ৯১ পয়সা।

দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বর মাসে একসময়ের মঙ্গাকবলিত উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের শ্রমিক-দিনমজুর’দের মজুরি’ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে– ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।

আর কম বেড়েছে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে যে অঞ্চলে, সেই সিলেট বিভাগে– ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

সরকারি সংস্থা বাংলা’দেশ পরিসংখ্যান ব্যু’রো (বিবিএস) যে হিসাব দি’চ্ছে, তাতে দেখা যায়, গত ক’য়েক মাস ধরেই রংপুর অ’ঞ্চলের শ্রমিক ও দিনমজুররা অন্য বিভাগে’র শ্রমিক ও দিন’মজুরদের চেয়ে বেশি মজুরি পা’চ্ছেন।

তবে অর্থনীতির গবেষ’ক সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোন’মিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচা’লক সেলিম রায়হান পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে’ছেন। তিনি বলেন, ‘এ তথ্য কোনোভাবেই গ্রহণ’যোগ্য নয়, কেউ বিশ্বাস ক’রবে না।’

সেলিম রায়হা’ন বলেন, ‘ঢাকার চেয়ে রংপু’রের শ্রমিক-দিনমজুররা বে’শি মজুরি পান, এটা কীভাবে সম্ভব? বিবি’এসের গবেষণা পদ্ধতিতেই গোলমাল আছে। প্রথম কথা হচ্ছে, এই মহামা’রিতে কোনো শ্রমিক-দিনমজুরেরই মজু’রি বাড়েনি; তারপর আবা’র রংপুর বিভাগের দিনমজুর-শ্রমিকদের মজুরি বেশি বে’ড়েছে, এটা কোনোভাবেই স’ম্ভব নয়।’

এ প্রসঙ্গে বিবিএ’সের মহাপরিচালক মোহাম্মদ তাজুল ইসলা’ম বলেন, ‘আমরা মাঠ’পর্যায় থেকে যে তথ্য পাই, সেটাই প্রকাশ করি।’

গত বছরের মার্চে দেশে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও তছনছ হয়ে যায়; পাল্টে যায় সব হিশাব-নিকাশ। যার প্রভাব পড়ে মজুরি সূচকে।

পরিসংখ্যান ব্যুরো বৃহস্প’তিবার মজুরি সূচকের হাল’নাগাদ যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি’র হার দাঁড়ি’য়েছে ৫ দশ’মিক ৯১ শতাংশ। এর অর্থ হলো, গত সেপ্টেম্বরে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের চেয়ে দিনমজুর-শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে’ছে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। আগের দুই মাস আগস্ট ও জুলাইয়ে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৮০ ও ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ।

গত অর্থবছরের শেষ দুই মা’স জুন ও মে মাসে এই হার ছিল য’থাক্রমে ৫ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থ’বছরে গড় মজু’রি সূচ’ক ছিল ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা খানিকটা কমে ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশে নে’মে আসে।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে তা আরও কমে ৬ দশমিক ১২ শ’তাংশে নেমে আসে।

চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলা’ইয়ে এই সূচক ৬ শতাংশে’র নিচে নেমে এসে ৫ দশমিক ৭২ শতাংশে দাঁড়ায়। আগস্ট মাসে তা সামান্য বেড়ে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশে ওঠে। সেপ্টে’ম্বরে আরও খানিক’টা বেড়ে ৫ দশমিক ৯১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনীতির পরিভাষায়, মূল্যস্ফীতির চেয়ে ম’জুরি বৃদ্ধির হার বেশি হলে কারও কাছে হাত পাত’তে হয় না। নিজেদের ক্রয়ক্ষমতা দিয়েই বাজার থেকে বেশি দামে পণ্য কেনা যায়।

বিবিএসের হিসাবে সেপ্টেম্বর মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশ’মিক ৫৯ শতাংশ। এতে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব ধরলে, দিনমজুরদের মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজার থেকে বেশি দামে তাদের পণ্য কিনতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি; বরং কর্মহীন হয়ে যাওয়া গরিব মানুষের জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের সহায়তা কর্মসূচি নিতে হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মজুরি সূচকের তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, ‘অর্থনীতি শাস্ত্রের কোনো যুক্তিতেই বিবিএসের মজুরি হার বৃদ্ধির ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়। সাধারণত যখন শ্রমিকের চাহিদা বাড়ে, সরবরাহ কম থাকে, তখন মজুরি বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এই মহামারির সময়ে শ্রমিকের চাহিদা বেশ কমেছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে বেকারের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। তাহলে মজুরি বাড়ল কোন ভিত্তিতে?

‘মজুরি যদি বাড়ত, তাহলে এই করোনাকালে সরকারকে এত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিতে হতো না। বিবিএস হয়তো অতীতের মজুরি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখে পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ করে এই তথ্য দিয়েছে, যা কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়।’

বিবিএস প্রতি মাসে কৃষিশ্রমিক, পরিবহন কর্মী, বিড়িশ্রমিক, জেলে, দিনমজুর, নির্মাণশ্রমিকসহ ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য সংগ্রহ করে মজুরি হার সূচক তৈরি করে। এসব পেশাজীবীর মজুরি খুব কম এবং দক্ষতাও কম। শুধু দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি পান বা নগদ টাকার পরিবর্তে অন্য সহায়তা পান, তার ভিত্তিতে কোন মাসে মজুরি হার কত বাড়ল, তা প্রকাশ করে বিবিএস। অথচ করোনায় এসব শ্রমিকই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

পরিসংখ্যান ব্যুরো যে ৪৪ ধরনের পেশাজীবীর মজুরির তথ্য নেয়, তার মধ্যে ২২টি শিল্প খাতের এবং ১১টি করে কৃষি ও সেবা খাতের পেশা। বেতনভোগী কিংবা উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের বিবিএসের মজুরি সূচকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

করোনাকালে মজুরির হার বাড়ল কীভাবে – এই প্রশ্ন জাতীয় মজুরির হার সূচক তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিবিএসের জাতীয় আয় শাখার একাধিক কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, মাঠপর্যায়ে যে তথ্য পাওয়া গেছে, এর ভিত্তিতে মজুরি সূচকের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

করোনাকালে দিন আনে দিন খায় এমন মানুষের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি দেশের একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় উঠে এসেছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে অতি গরিব, গরিব, গরিব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানুষ এবং গরিব নয় এমন মানুষের দৈনিক আয় ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে গরিব মানুষের আয় ৭৫ শতাংশ ও অতি গরিবের আয় ৭৩ শতাংশ কমেছে। আয় কমে যাওয়ায় সার্বিকভাবে ২৩ শতাংশ মানুষ নতুন করে গরিব হয়েছে।
রংপুরে মজুরি বাড়ছে সবচেয়ে বেশি, সিলেটে কম

মহামারিতে দারিদ্র্য দ্বিগুণ বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছে বলে গত জানুয়ারিতে হিসাব দিয়েছিল সানেম।

আরেক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে, করোনার কারণে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ৩৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ২০১৯ সাল শেষে দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। করোনাকালে আয়বৈষম্যও বেড়েছে বলে মনে করে সিপিডি।

গবেষণা সংস্থাগুলোর গবেষণা প্রতিবেদনে করোনাকালে সমাজের সবচেয়ে নিচে থাকা মানুষের আয় বা মজুরি কমার তথ্য উঠে এলেও বিবিএসের জাতীয় মজুরি হার সূচকে উল্টো চিত্র দেখা যায়। সে জন্য সরকারি সংস্থাটির তথ্য-উপাত্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বরাবর প্রশ্ন ওঠে।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশই হচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। মোট শ্রমশক্তির ৮৫ দশমিক ১ শতাংশই এ খাতে নিয়োজিত। আর ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে।

অন্যদিকে কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত মোট শ্রমশক্তির ৯৫ দশমিক ৪ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। শিল্প খাতের ৮৯ দশমিক ৯ শতাংশ, সেবা খাতের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ শ্রমিক অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত।

কোন বিভাগে মজুরি কত বাড়ল

বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা বিভাগে মজুরি বেড়েছে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। আগস্ট ও জুলাইয়ে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭২ ও ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামে মজুরি বাড়ার হার দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশ। আগস্ট ও জুলাইয়ে ছিল ৫ দশমিক ৮১ ও ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

রাজশাহীতে সেপ্টেম্বরে মজুরি বাড়ার হার ছিল ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ; জুলাইয়ে ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

রংপুরে সেপ্টেম্বরে মজুরি বেড়েছে ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। আগস্টে বেড়েছিল ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ; জুলাইয়ে বৃদ্ধির হার ছিল ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগে সেপ্টেম্বর মাসে মজুরি সূচকের হার ছিল ৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আগস্ট ও জুলাইয়ে ছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭৪ ও ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

খুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে মজুরি বেড়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। আগস্ট ও জুলাই মাসে বেড়েছিল যথাক্রমে ৫ দশমিক ৫৪ ও ৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

আর সিলেট বিভাগে সেপ্টেম্বর মাসে মজুরি সূচকের হার ছিল ৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আগস্টে ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ; জুলাইয়ে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ।
সূত্র: নিউজবাংলা