রবিবার, ২৩শে জানুয়ারি, ২০২২ ইং, সকাল ১০:৫৬

বিধিনিষেধের ১১ দফা বিয়েসহ ঘরোয়া অনুষ্ঠানে কোনো বাধা নেই

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব টিকাদানে
*বিয়ের অনুষ্ঠান, হোটেল-মোটেল পর্যটন কেন্দ্র চলবে
*১৩ জানুয়ারি পরবর্তী সরকারি কোনো অনুষ্ঠান স্থগিত হয়নি
* কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের অনুষ্ঠান স্থগিতের ঘোষণা

বিয়ে, আকদ, পিকনিক, রেস্তোরাঁ বা কমিউনিটি সেন্টারে পারিবারিক অনুষ্ঠানে আপাতত কোনো বাধা নেই। করোনা রোধে সারা দেশে ১১ দফা বিধিনিষেধ জারি হলেও ঘরোয়া ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান ও পর্যটন কেন্দ্র চালু থাকবে। খোলা থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চলবে বাণিজ্য মেলা। সরকার চাচ্ছে এ বিধিনিষেধের কারণে সাধারণ মানুষ যেন টিকা নেওয়ায় আগ্রহী হন।

দেশে প্রচুর টিকা মজুত থাকলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় তা দেওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে সোমবার ঘোষিত বিধিনিষেধে বড় কোনো বাধা-ধরা নিয়ম দেওয়া হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। তারপরও সোমবার বিধিনিষেধ জারির পর থেকে পর্যটন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বিধিনিষেধ জারি হলেও ১৩ জানুয়ারি পরবর্তী সরকারি কোনো অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিতের ঘোষণা আসেনি। এ বিধিনিষেধের মধ্যে কতটুকু কী করা যাবে, কী করা যাবে না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনাও নেই। কিন্তু বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সংগঠন থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বেসরকারি সংগঠনের অনুষ্ঠান স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার থেকে বিধিনিষেধ কার্যকরের ঘোষণা দেওয়ায় সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে, শুক্রবার অনুষ্ঠেয় সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজকরা। এদিন বেশকিছু বিয়ের অনুষ্ঠান আছে। অনেক আগে থেকেই এগুলোর আয়োজন চলছে। কার্ড ছাপানো, হোটেল বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া, অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় প্যান্ডেল করে বিয়ে বা আকদের আয়োজন চলছে। এ অবস্থায় হঠাৎ বিধিনিষেধ দেওয়ায় চোখে অন্ধকার দেখছেন বর-কনের বাবা-মা ও অভিভাবকরা। তারা অনুষ্ঠান করতে পারবেন কিনা তা জানার জন্য বিভিন্ন স্থানে ছোটাছুটি করছেন। কিন্তু কোথাও স্পষ্ট কোনো উত্তর বা ধারণা পাচ্ছেন না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার খলিলুর রহমান মঙ্গলবার রাতে যুগান্তরকে বলেন, বিয়ে বা আকদের মতো ঘরোয়া অনুষ্ঠান প্রতিপালনে আপাতত কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এসব অনুষ্ঠানে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানতে হবে। তিনি বলেন, সরকারি আদেশে খোলা জায়গায় সামাজিক-রাজনৈতিক সব ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটা মেনে চলতে হবে।

বৃহস্পতিবার থেকে বিধিনিষেধ কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে বলা হয়, কোভিড আক্রান্তের হার বাড়ছে। ফলে খোলা জায়গায় সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সমাবেশ পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে দোকান, শপিংমল ও বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা এবং হোটেল-রেস্তোরাঁসহ সব জনসমাগমস্থলে বাধ্যতামূলকভাবে সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। অন্যথায় আইনানুগ শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় টিকা সনদ দেখানোর বাধ্য-বাধকতা দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে এখনি সেটা কড়াকড়িভাবে পালন না করতে বার্তা দেওয়া হয়েছে। তবে মাস্ক পরার ক্ষেত্রে যাতে কোনো ঢিলেমি না থাকে তা কড়াভাবে প্রয়োগ করতে বলা হয়েছে। বিধিনিষেধ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত উচ্চপর্যায়ের এবং মাঠ প্রশাসনের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার জিএসএম জাফরুল্লাহ মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, বিধিনিষেধের বিষয়ে ডিসি ও ইউএনওদের ব্রিফ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হোটেলের টিকা সনদের কড়াকড়ি আরোপ সম্ভব কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিধিনিষেদের মেয়াদ শুরু হোক, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে টিকা গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ জোর দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সব খোলা রেখে হোটেল-রেস্তোরাঁ বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে আলাদাভাবে উল্লেখ করায় পর্যটন সেক্টরে নেতিবাচক প্রভাব শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁর কথা বিধিনিষেধে উল্লেখ থাকায় আমরা আবারও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। গত দুদিনে কক্সবাজার ও ঢাকা মিলিয়ে আমার তিনটি প্রতিষ্ঠানের ১০টি অনুষ্ঠান বাতিল হয়ে গেছে। যেগুলো জানুয়ারির শেষ দিকে ও ফেব্রুয়ারিতে হওয়ার কথা ছিল। তিনি বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের মতামত কেউ নেয় না। আমাদের দুঃখ কেউ বুঝে না। আমরা প্রণোদনাও পাই না। এ খাতের উদ্যোক্তরা খুবই অসহায়।

হবিগঞ্জের ডিসি ইশরাত জাহান এ প্রসঙ্গে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মানুষকে জরিমানা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সরকার ঘোষিত নিয়ম পরিপালনের চেষ্টায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব থাকবে। তবে কেউ যদি এসব উদ্যোগে ব্যাঘাত ঘটান তখন কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রাজধানীতে চলমান বাণিজ্যমেলা স্থগিত করেনি সরকার। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলার প্রস্তুতি চলছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বন্ধের ঘোষণাও আসেনি। ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের সিটি নির্বাচন ও টাঙ্গাইল-৭ আসনের উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্ণ প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসি। ঢাকায় ডিসি সম্মেলন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারিত আছে ১৮-২০ জানুয়ারি। সম্মেলনের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। এখনো পর্যন্ত সম্মেলন স্থগিতের কোনো ইঙ্গিত নেই। ২৩ থেকে ২৮ জানুয়ারি পুলিশ সপ্তাহ অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারিত আছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত এসব অনুষ্ঠান স্থগিত বা বাতিলের কোনো ঘোষণা আসেনি।

তবে বিধিনিষেধ জারির পরপরই বেসরকারি পর্যায় থেকে কয়েকটি অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের শতবর্ষে মিলনমেলা সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি একে আজাদ ও মহাসচিব রঞ্জন কর্মকার স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য শতবর্ষের মিলনমেলা অনুষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

রাজধানীকেন্দ্রিক সাংবাদিকদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির বার্ষিক ফ্যামিলি ডে ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারিত ছিল। সোমবার সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ফ্যামিলি ডে অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। সচিবালয়ভিত্তিক সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএসআরএফ) সাধারণ সম্পাদক মাসউদুল হক জানিয়েছেন, তাদের সংগঠনের ১৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ফ্যামিল ডে স্থগিত করা হয়েছে।

বিধিনিষেধের মধ্যেও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাণিজ্যমেলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (রপ্তানি) মো. হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিধিনিষেধের আলোকে আমরা দেখেছি, নির্দেশনা অনুযায়ী বাণিজ্যমেলার কার্যক্রম চালাতে কোনো অসুবিধা নেই। মেলা বন্ধ করার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।