শনিবার, ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং, সকাল ১১:৫৮

আতঙ্কে ঘোড়াঘাটের প্রভাবশালীরা

দিনাজপুর, বিশেষ প্রতিনিধি:

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ওয়াহিদা খানম নিজের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি ‘এসিল্যান্ড’ এর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর এসিল্যান্ড পদটি খালি থাকায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে ভূমি দখলকারী ঘোড়াঘাটে দখলদারিত্বের রাজত্ব তৈরি করে। অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্ছার ইউএনও ভুমিদস্যুদের রোষানলে ছিলেন। এ কারণেও তার ওপর হামলা হতে পারে বলেও মনে করছেন স্থানীয়রা। তবে ‘কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসে’ কিনা সে ভয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা আতঙ্কে রয়েছেন।

ঘোড়াঘাটের ইউএনও এবং তার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা ওমর আলী শেখের উপর হামলায় রিমান্ডে নেয়া যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা আসাদুল ইসলামসহ আসামীদের দফায় দফায় জিঙ্গাসাবাদ করছে গোয়েন্দা পুলিশ। তাদের কাছে থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার পর গতকাল উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা’র গাড়ী চালক ইয়াসিন আলী ও পরিষদের পরিছন্নতাকর্মী অরসোলা হেমব্রম নামের দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। এতে প্রভাবশালীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তারা কার নাম বলে দেন সে ভয়ে সে আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত।

জানা যায়, ঘোড়াঘাট উপজেলায় এসিল্যান্ড’র পদটি গত ২৫ বছর ধরে খালি ছিল। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে যোগদানের পর থেকে ওয়াহিদা খানম ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এই পদের দায়িত্ব পালন করতেন। তবে তিনি জমি সংক্রান্ত বিষয়ে নিয়ম নীতিতে খুবই কঠোর ছিলেন।

এদিকে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসাইন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমের শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গতকাল তাকে আইসিইউ থেকে এইচডিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। সেখানেও নিবিড় পরিচর্যায় রয়েছেন তিনি। তবে এখনো অবশ হওয়া ডান পাশের অংশের কোনো উন্নতি হয়নি। গতকাল হাসপাতালের নিউরো ট্রমা বিভাগের প্রধান নিউরো সার্জন ও গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ওয়াহিদা কথা বলতে পারছেন। স্মৃতিশক্তি ফিরে এসেছে, পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন, সন্তানের খোঁজ খবর নিচ্ছেন। স্বামীর সঙ্গে কথা বলছেন। তার মানে আমরা বুঝতে পারি, জ্ঞানের দিক থেকে তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরছেন। যেহেতু তার মাথায় অনেক আঘাত লেগেছে, তাই হালকা ব্যথা আছে। বাকি জিনিসগুলোর অনেক উন্নতি হয়েছে। ওয়াহিদার ৭২ ঘন্টার অবজারভেশন গত রোববার রাতেই শেষ হয়েছে। তাই গতকাল সকালে মেডিক্যাল বোর্ডের সব সদস্য বসে সমন্বিত সিদ্ধান্তে তাকে আমরা স্টেপ-ডাউন করে এইচডিইউতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ওয়াহিদার ডান অংশ অবশ বিষয়ে তিনি বলেন, তার ডান পাশে যেটা অবশ ছিল সেটার অবস্থার এখনও কোনও উন্নতি হয়নি। কবে হবে বা কতদিন লাগবে সে বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারবো না। সেটার জন্য যে প্রয়োজনীয় ফিজিওথেরাপি সেটা আমরা শুরু করে দিয়েছি। এখন বাকিটা সময়ের সঙ্গে জবাব দেবে।

দিনাজপুর থেকে মাহফুজুল হক আনার জানান, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের ইউএনও’র ওপর হামলার মামলা সংক্রান্ত বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল ঘোড়াঘাট উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা’র গাড়ী চালক ইয়াসিন আলী (৩০) ও পরিষদের পরিছন্নতাকর্মী অরসোলা হেমব্রম (৩৮) গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। তবে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে এ ব্যাপারে কোন কথা বলছেন না।

ইউএনও’র উপর সরকারী বাসভবনে ঢুকে বর্বরোচিত হামলার সাথে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির বিষয়ে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে সকল স্তরের মানুষ সোচ্চার হচ্ছেন ধীরে ধীরে। বিভিন্ন স্তরের মানুষের কথা বললে তাদের মতে এটি নিছক চুরি’র ঘটনা হতেই পারে না। চুরি করতে সিসি ক্যামেরায় আচ্ছাদিত উপজেলা চত্বরের ভিতরে ঢুকে দ্বিতল ভবনের ইউএনও কামরায় প্রবেশ করার দুঃসাহস দেখানোর কথা নয়। তারপরে ইউএনওকে যেভাবে আঘাত করা হয়েছে, তা পরিস্কারভাবে হত্যার উদ্দেশ্যই প্রমান করে। এছাড়া এতকিছুর পর কথিত চোরেরা মালামাল না নিয়ে চলে গেলেনই বা কেন?

এছাড়া ইতিপূর্বে এক কর্মচারী কর্তৃক ইউএনও’র ড্রয়ার খুলে টাকা চুরি’র ঘটনাও ঘটেছে। একই ঘটনায় দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের বাস ভবন থেকে দুই কর্মচারীর মধ্যে একজনকে ঘোড়াঘাটে বদলি করা হয়েছে। অতএব কর্মকর্তাদের অফিস বা বাসায় সাধারন চুরির ঘটনা নুতন নয়। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ঘোড়াঘাটের পার্শ্ববর্তী উপজেলা নবাবগঞ্জ উপজেলায় কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার ঘটনা ঘটেছিল। বাথরুমে পালিয়েও সেদিন রক্ষা পায়নি ইউএনও ফরহাদ। এ সময় পুলিশ নিরব দর্শকের ভ‚মিকা পালন করেছিল বলে সে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনার পর থেকেই নবাবগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রেফতার অভিযান শুরু করলে মামলাটি ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন এসআই (বর্তমানে ওসি) বজলুর রশিদ। তদন্ত করে মোট ৩২ জনকে আসামী করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। যা এখন স্বাক্ষী পর্যায়ে রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে প্রভাবশালীদের আশির্বাদ না থাকলে দিনে দুপুরে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব ছিল না। ঘোড়াঘাট টিএনও’র বাসায় ঢুকে হামলার বিষয়টিও খুব একটা আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যেই একটি টিভি চ্যানেল টিএনও কর্তৃক ঘোড়াঘাট এলাকায় জমি ক্রয়ের ইঙ্গিত করা হয়েছে। এর সাথে বালু মহালের ড্রেজার ধ্বংসসহ বিভিন্ন প্রশংসীয় কার্যক্রম করার সুনাম রয়েছে টিএনও ওয়াহিদা খানমের। সার্বিক বিষয়গুলি পর্যালোচনা করলে একটি বিষয় সামনে এসে যায় তা হলো স্বার্থ সংশ্লিষ্ট। স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়টি যে খুব একটা ছোট খাট তাও না কেননা তা হলে হত্যার চেষ্টার মত ঘটনার জন্ম হতো না। অবশ্য আশার আলো হচ্ছে; আহত ইউএনও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন। তিনি হয়তো প্রকৃত সত্যতা সামনে তুলে আনতে পারবেন এক সময়। কিন্তু এর মধ্যে সাধারণ নিরীহ কেউ যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয় সে বিষয়টি নজরে রাখছেন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ।

ইউএনও’র উপর হামলা ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় মানুষজন ছাড়াও রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দের মধ্যে একটা ভীতিকর অবস্থা বিরাজ করছে। তাদের ভয় কেঁচো খুড়তে সাপ না বেরিয়ে আসে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী’র নজর রয়েছে বিষয়টির উপর। ফলে দায়ী ব্যাক্তিদের ছাড় পাওয়া খুব একটা সহজ হবে না। একদিন আগে বা পরে। র‌্যাব কর্তৃক আসাদুল, নবিরুল ও সান্টুকে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর এবং আসাদুলের বরাতে নিছক চুরির ঘটনার কথা উল্লেখ করায় সকল স্তরের মানুষ এটিকে সহজভাবে গ্রহন করেননি। অবশ্য প্রেস ব্রিফিংকালে র‌্যাব কর্মকর্তাও নিছক চুরি’র বিষয়টিকে স্বাভাবিক নেননি বলেই মনে হয়েছে। কেননা তিনি অধিক তদন্তে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে আর যাই হোক ঘটনার সাথে বড় কোন স্বার্থ এবং প্রভাবশালী মহলের সংযোগ থাকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনলে হয়তো অতি দ্রুতই প্রকৃত ঘটনা উম্মোচিত হয়ে যাবে। আমাদের চৌকস গোয়েন্দা পুলিশ মূল ঘটনা উৎঘাটন করবে এমন আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন সচেতন মহল।

তদন্ত শুরু হয়নি: ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার ঘটনায় পাঁচ দিন পার হলেও এখনো তদন্ত শুরু করতে পারেনি বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। গতকাল দিনাজপুরর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ও বিভাগীয় তদন্ত কমিটির সদস্য আসিফ মাহমুদ জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর রংপুর বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল ওয়াহাব ভূঞা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. জাকির হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির অপর দুই সদস্যের মধ্যে পুলিশ রংপুর রেঞ্জ ডিআইজির এক জন প্রতিনিধি রয়েছেন। তিনি আরো জানান, হামলার তদন্ত কমিটি গঠনের চিঠি আমি পেয়েছি। কিন্তু কমিটির প্রধান এখন পর্যন্ত তদন্তের ব্যাপারে আমাকে কোনো চিঠি দেয়নি। তাই তদন্ত কমিটির কাজ শুরু করতে পারিনি।