সোমবার, ২রা আগস্ট, ২০২১ ইং, সকাল ১১:২২

বিদ্যুৎ খাতে অতিরিক্ত ভর্তুকির জোগানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপ বাড়ছে

অনলাইন ডেক্স::

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের দায় মেটাতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অতিরিক্ত ভর্তুকির জোগান দিতে হচ্ছে। ফলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের জন্য ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ ছিল। কিন্তু ওই বরাদ্দ দিয়ে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তুকির চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়েছে। বাকি অর্থ নতুন অর্থবছরের বাজেট থেকে সমন্বয় করা হবে। সরকার বিদ্যুৎ খাত ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাচ্ছে। আর দিন দিন লোকসানের পরিমাণ বাড়ছেই। কেবল দুই মাসেই বেসরকারি খাতের ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্লান্ট (আইপিপি), রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে সরকারের ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকারও বেশি লোকসান হয়েছে। অর্থ ও বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বাজেটে বিদ্যুতের ভর্তুকি বাবদ একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে প্রতি মাসে ভর্তুকির দাবি আসে। বাজেটে যে বরাদ্দ রাখা হয় তা দিয়ে চাহিদা মেটে না। সেজন্য পরবর্তী বাজেটের অর্থ দিয়ে আগের বাজেটের চাহিদা মেটাতে হয়। এবার বিদ্যুতের ভতুর্কি বাবদ যে বরাদ্দ রাখা ছিল, তা দিয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়া সম্ভব হয়েছে। পরের ৪ মাসের ভর্তুকি আগামী বাজেটের বরাদ্দ থেকে দিতে হবে।

মূলত সারা বছরের আয় ও ব্যয়ে প্রাক্কলন করেই বাজেট প্রণীত হয়। তারপর যদি কোনো খাতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয় তখন সরকারের ওপর চাপ বাড়ে। আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কিনে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে সরকারের লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৯৩৭ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদ্যুৎ খাতে লোকসান হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। তাছাড়া রেন্টাল পাওয়ার প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ কিনে ক্ষতি হয়েছে ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ২৮ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান হয়েছে ২৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ৩০২ কোটি ২১ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে বেসরকারি খাতের আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে ২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকারও বেশি সরকারের লোকসান দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যা ছিল ১ হাজার ২৬৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। সেজন্য ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি-সংক্রান্ত লোকসানসহ ওই দুই মাসের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ ভর্তুকি দিতে চায়। সেজন্য বিদ্যুৎ বিভাগ মোট ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে ভর্তুকি হিসেবে দেয়ার জন্য অর্থ বিভাগে প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
সূত্র জানায়, চলতি বাজেটে বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু আগের অর্থবছরের মার্চ থেকে চলতি অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ মাসে মোট ৭ হাজার ৯৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ভর্তুকি বাবদ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে দেয়া হয়েছে। এমন অবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারির আংশিক ভর্তুকি বাবদ ১ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে ছাড় করেছে অর্থ বিভাগ। বাকি অর্থ আগামী অর্থবছরের বাজেট থেকে দেয়া হবে। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের লোকসান মেটাতে ২০১৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ৬ বছরে ৪২ হাজার ৮৫১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ভর্তুকি বাবদ দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চলমান রাখার স্বার্থে সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের লোকসান মেটানোর জন্য এই আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
সূত্র আরো জানায়, ১০টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লোকসান বাবদ ক্ষতি হয়েছে ২৮৭ কোটি ১১ লাখ টাকা। ৩৭টি ফার্নেস অয়েল, ১৪টি গ্যাস, ৪টি সোলার, ৯টি ডিজেলভিত্তিক ও একটি কয়লাভিত্তিকসহ মোট ৬৫টি আইপিপি রয়েছে। ওসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল ব্যবহার করা হয়। যার দাম গ্যাসের তুলনায় বেশি। সেজন্য লোকসানও বেশি। আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ১১ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে চাহিদা না থাকায় ৯ হাজার ২২৯ মেগাওয়াট অর্থাৎ সক্ষমতার ৮০ শতাংশ উৎপাদন করা হয়। আর বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে না থাকলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। যা লোকসান বাড়ার অন্যতম কারণ। তাছাড়া আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে গড়ে ইফনিটপ্রতি উৎপাদন খরচ যথাক্রমে ৮ দশমিক ৯৭ ও ৮ দশমিক ৪১ টাকা, সেখানে বিক্রয়মূল্য ৫ দশমিক ১৭ টাকা।

আইপিপি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৮৪টি কোম্পানির সঙ্গে সরকারের নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি অনুযায়ী মূল্য পরিশোধের চুক্তিসহ তা সময়মতো বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বিধায় লোকসান বাড়ছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আর যতোদিন তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চলবে, ততোদিন লোকসান কমানোর কোনো উপায় নেই। বর্তমানে কয়লা বা অন্যান্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বেশকিছু বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। ওসব প্রকল্প চালু করে তেলভিত্তিক কেন্দ্র বন্ধ করা গেলেই লোকসান কমে আসবে। পায়রার পুরোটা, মাতারবাড়ী ও রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করা গেলে ৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ চলে আসবে। সেগুলোর দাম তেলভিত্তিক বিদ্যুতের চেয়ে অনেক কম হবে। সরকার বিগত২০০৯ সাল থেকেই বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে জোর দিচ্ছে। তাতে গত এক দশকে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫ গুণ হয়েছে। যদিও ডিজেলচালিত বেশকিছু বেসরকারি কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। আর তাতেই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) প্রতি বছর বড় অংকের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে লোকসান ও মূল্য বৃদ্ধির পেছনে সংশ্লিষ্টরা দুটি কারণকে চিহ্নিত করেছে। তার একটি কারণটি হলো অদক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থা। তাতে সক্ষমতার অর্ধেকের বেশি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। দ্বিতীয় কারণটি হলো বেসরকারি খাতে বিশেষত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ। ওই চার্জকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান অনেক কমে আসতো।
এদিকে এক বছরের ব্যবধানে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কিনে সরকারের দ্বিগুণ ক্ষতি প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগ সচিব মো. হাবিবুর রহমান কিছু বলতে পারবেন না বলে জানান। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানও এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি নন। এমনকি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সদস্য (প্রশাসন) মো. সাঈদ কুতুব, সদস্য (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) মো. মাহবুবুর রহমান ও সচিব সাইফুল ইসলাম আজাদও বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

অন্যদিকে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইপিপিএ) প্রেসিডেন্ট ইমরান করিম জানান, চলতি ২০২০-২১ হিসাব বছরের বাজেটে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ব্যবহৃত তেলের ওপর কাস্টমস ডিউটি ও ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। যে কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর আইপিপি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেছনে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেছে। তাছাড়া গত বছরের তুলনায় এ বছর বিদ্যুতের ব্যবহারও কিছুটা বেড়েছে। তাতেও সরকারের ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। আর সার্বিকভাবে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে ব্যয় হয়, গ্রাহক পর্যায়ে সরকার তার চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ওই অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি সচিবালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুতের মাস্টারপ্ল্যান রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সরকারের বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প সময়মতো চালু করতে না পারায় রেন্টাল প্রকল্পগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল। চাহিদার কথা মাথায় রেখেই রেন্টাল প্রকল্পগুলো চালু রাখা হয়েছে। তবে যতো দ্রুত সম্ভব অধিকাংশ রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট ভিত্তিতে দু-একটি গ্যাসভিত্তিক রেন্টাল কেন্দ্র চালু থাকবে।